ঢাকা , শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫ , ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

​দখল-দূষণে নাকাল কোহেলিয়া

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৫-০৩-২০২৫ ০৪:০৩:১১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৫-০৩-২০২৫ ০৪:০৩:১১ অপরাহ্ন
​দখল-দূষণে নাকাল কোহেলিয়া ​ছবি: সংগৃহীত
দেশের উপকূলীয় অঞ্চল মহেশখালীর অন্যতম প্রধান নদী কোহেলিয়া। একসময় এই নদী ছিল এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের চাপে নদীটি সংকুচিত ও দূষিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মাতারবাড়ী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য সরাসরি কোহেলিয়া নদীতে ফেলা হয়েছে। এতে পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, অবৈধ দখল ও অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্যের কারণে নদীটি প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে।

কোহেলিয়া নদী মূলত মহেশখালীর পূর্ব পাশ দিয়ে চলে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। নদীটি লবণ চাষ, মৎস্য শিকার ও নৌপরিবহনের জন্য এক সময় বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের পর থেকে মাতারবাড়ী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শুরু হলে এর নাব্য কমতে শুরু করে। নদীর কয়েকটি স্থানে পলি জমে প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষাকাল এলে এটি কিছুটা জোয়ারের পানির সংস্পর্শে আসে। শুকনো মৌসুমে থাকে মৃতপ্রায়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন অনুসারে, গত পাঁচ বছরে নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। গড় গভীরতা ১২-১৫ ফুট থেকে নেমে ৩-৪ ফুটে দাঁড়িয়েছে। অপরিকল্পিত ড্রেজিং, অবৈধ দখল ও শিল্পকারখানার বর্জ্য ফেলায় নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

নদীর পানি দূষিত হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে মাতারবাড়ী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত বর্জ্য। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় প্রচুর পরিমাণে বালু ও কাদা নদীতে ফেলা হয়। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বিঘ্ন ঘটে। এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার পর এর ব্যবহৃত পানি ও রাসায়নিক বর্জ্য কোহেলিয়া নদীতে ফেলায় পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

পরিবেশবিদদের মতে, নদীতে ক্ষতিকর ধাতু সিসা, পারদ ও আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এগুলো মাছসহ অন্যান্য জলজপ্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কোহেলিয়া নদীতে আগে অন্তত ২৫-৩০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে এই সংখ্যা ১০-১২-তে নেমে এসেছে। স্থানীয় জেলেরা জানান, নদীর পানি এতটাই দূষিত হয়েছে যে এখন আর আগের মতো মাছ ধরা সম্ভব হচ্ছে না।

কোহেলিয়া নদীর দুই তীরে বহু জেলে পরিবার বাস করে। এ থেকে মাছ ধরাই তাদের প্রধান কাজ। নদী করুণদশায় পড়ায় অধিকাংশই এখন বিকল্প পেশা খুঁজছেন। অনেকে ঝুঁকি নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাচ্ছেন।

স্থানীয় জেলে বাহাদুর মিয়া বলেন, ‘আগে নদী থেকে দিনে ৫-৭ কেজি মাছ ধরতে পারতাম। এখন এক কেজি পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার। নদীর পানি এত নোংরা ও দূষিত যে মাছ টিকে থাকতে পারছে না।’ এদিকে, মাছ চাষের জন্য কোহেলিয়া নদীর পানি ব্যবহার করা হতো। কিন্তু বর্তমানে নদীর পানি দূষিত হওয়ায় চিংড়ি চাষও হুমকির মুখে। স্থানীয় চিংড়ি খামার মালিকরা জানান, ‘দূষিত পানির কারণে তাদের খামারে মাছ মারা যাচ্ছে। এতে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।’

নদীর অবস্থা নিয়ে সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড বেশ কয়েকবার আলোচনা করলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নদীপাড়ের মানুষ দাবি করছেন, সরকার চাইলে কোহেলিয়া নদী পুনরুদ্ধার সম্ভব। তার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন।

পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মহেশখালী শাখার সাধারণ সম্পাদক ও কোহেলিয়া নদী রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেন, ‘কোহেলিয়া নদী রক্ষায় প্রথমত সব ধরনের বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে নিয়মিত ড্রেজিং করতে হবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে এটা করতে হবে। কোহেলিয়া নদী ধ্বংস হলে এ অঞ্চলের ৫ হাজার জেলে পরিবারসহ প্রায় দুই লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নদী ধ্বংস করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না।

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স


এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ